অ্যালেন

শনিবারের ফুটফুটে বিকেল। ৪:৪০ বাজে। ইয়র্ক মিন্সটারের গায়ের একাধিক সর্পিল গলির একটা গলি। প্রায় দক্ষিনেশ্বরের গায়ে যেমন অজস্র গলি আছে, কচুরি-মিষ্টি-শাঁখা-পলা-পেটমোটা শিব-মশা তাড়ানোর ব্যাট-আর-যাহা-কিছু সবই পাওয়া যায়, ওরকমই একটা গলি। এটায় প্রধানত সার দিয়ে খাবারের দোকান। রোমানদের তৈরি শহর বলে এটা বাকি ইংরেজ শহরদের থেকে আলাদা। যাইহোক সেটা আজকের কথা নয়। কথা হল, ওই খাবারের গলিটায় ফিশ অ্যান্ড চিপ্স বাগিয়ে আমি দোকানের উল্টোদিকে মিন্সটারের গায়েই একটা সীটে, রোদে বসে খাচ্ছি।


বৃষস্কন্ধ

ভারতে স্নাতক অথবা স্নাতকোত্তর স্তরে কখনও শিক্ষকতা করি নাই তবে করিতে দেখিয়াছি। স্নাতক স্তর অবধি শিক্ষা আমি গ্রহণও করিয়াছি। শিক্ষকের কেহ ছিলেন রাশভারী, কেহ বা রাশভারী হইবার প্রয়াসী, কেহ বা অমায়িক, মিশুকে। আমি নিজে শিক্ষকতা করিব বলিয়া কোনওদিন ভাবি নাই ফলে তাঁহাদের তরফের আচরণের কার্যকারণ লইয়া ভাবিবার বিশেষ অবকাশ রাখি নাই। সেই সাথে এও বলিয়া রাখা ভালো যে আমার অনুপস্থিতির হারের উপর ভরসা করিয়া বলা চলে, এই কারণে তাঁহাদের বিরাগভজন হইলেও পীড়ার কারণ কখনও হই নাই।


লোকটা

তখনও চশমাটা পড়েনি লোকটা। ভোরের আধো-অন্ধকারে আয়নায় অস্পষ্ট অথচ ভীষণ চেনা একটা মুখ। রোজই আলগোছে নজরে পড়ে যায়, বাথরুমের আয়নায়, জানলার কাঁচে, গাড়ির গায়ে, আয়নায়, আরও কত কী-তে। কিন্তু তখন মন অন্য চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। নজর করে না। যখন সত্যিই নজর করতে বসে,  তখন কিন্তু কোনও মিল পায় না নিজের সাথে। এই বুড়োটে, হিংসুটে মুখটা অতি পরিচিত, কিন্তু নিজের বলে বিশ্বাস হয় না। এর সাথে যেন লোকটার ইমেজটা খাপ খায় না। বিট্রে করে মুখটা। লোকটা দেখতে ভালো। সবাই বলে। লোকটা নিজেও জানে। জানে বলেই এই দিনগুলোয় ভীষণ রাগ হয় আয়নার দিকে তাকিয়ে। আজও সেরকম একটা দিন। এই দিনগুলো বলে কয়ে আসে না। হঠাৎ হাজির হয়ে গোটা দিনটা নষ্ট করে দেয়। সবার ওপর রাগ হয় তখন। আজও হবে। কিন্তু আজ একটা বিশেষ দিন। লোকজন এড়ানো যাবে না কোনওমতেই। অবশ্য এমনিতে লোকজন পরিবৃত হয়েই থাকতে ভালোবাসে লোকটা। মধ্যমণি হয়ে থাকার লোভ প্রচন্ড। না, ঠিক লোভ না, কিরকম একটা প্রয়োজনীয়তা। শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য হাওয়ার মতই দরকার হয়। সেটা আদায়ও হয়। কিন্তু এই দিনগুলো এলেই আর মাথার ঠিক থাকে না। না না, মাথার ঠিকভুল না, মাথা ঠিকই থাকে। ইন ফ্যাক্ট এই মাথার জোরেই এতগুলো লোককে আজও ধরে রেখেছে নিজের চারদিকে। নইলে এই ৬৪ বছর বয়সে কজনই বা লোকটার মত পাত্তা পায়? আজ সেই ৬৪ বছর পূর্ণ হবার দিন। আজকের দিনটা এইভাবে শুরু না হলেই ভালো হত।

ইঙ্গ-ভোট

ভোট দিলাম। এদেশে (ব্রিটেনে) প্রথম। আর জীবনে দ্বিতীয়বার। এদেশে এ কবছরে বেশ কটা ভোট হয়ে গেল। এখানে কমনওয়েল্থ দেশগুলো ভোট দিতে পায় আর রেজিস্টার না করলে ফাইন করে বলে রেজিস্টার করেও রেখেছিলাম। কিন্তু এদের রাজনীতির উদ্দেশ্য বিধেয় কিছু নিয়েই খুব একটা মাথা ঘামাইনি। আমি ভারতীয়, এদেশে থাকি, বেসিক হ্যিউম্যান রাইটগুলো পেলেই চলে যায়। কোন পার্টির কিসের কারণে কী পরিবর্তন আনে, মাথা বিশেষ ঘামাতে লাগত না।

Sci-Fi সঙ্কট

একটা জিনিস আমি অনেকদিন ধরেই ভাবি, বাংলায় সাইন্স ফিকশন লেখা এবং পড়া, দুটোই এত কম কেন? এদিকে তো সাইন্স পড়ার জন্যে লোকে দরে স্কুল পাল্টে ফেলছে (নিজের স্কুলে চান্স না পেলে, বা আরও ভালো স্কুলে চান্স পাবার জন্যে)। তাহলে বাংলায় সাই-ফাই লিখছে নাই বা কেন, আর যে কটা তবু আছে সেগুলোও বা কেন বিশেষ সেলিব্রেটেড নয় ভাবতে অবাক লাগে। আর তখনই মনে হয়, সত্যি সাইন্স ভালবেসে কজনই বা সাইন্স পড়ে? কজনই বা সাইন্স পড়ে সত্যি নিজের জীবনে তাকে দেখতে পায় বা ব্যবহার করে? বরং এড়িয়ে চলে। অঙ্ক কত বাজে জিনিস বলতে পেলে আর কিছুই চায় না। বোধহয় অঙ্ক ভালবাসি না বলার লজ্জার চেয়ে অঙ্ক আসলে কত ভালোবাসার অযোগ্য, এটা বললে নিজেকে আরেকটু বেশি ভালবাসা যায়। ফলে সেই জাত যে সাইন্স ফিকশন কম পড়বে সেটাই তো স্বাভাবিক।

Mission: বাংলা

ক'দিন ধরে এতরকম ভ়ার্সান শুনে চলেছি, ভাবলাম নিজের রিসার্চ নিজেই করা উচিত। দেখলাম ব্যাপারটা এইরকম:

প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক তিনটি ভাষার মধ্যে একটি বাংলা হতেই হবে।

এই বক্তব্যে নানা লোকের নানা ভয়। কারুর ভয় "বাধ্যতামূলক" নিয়ে। কারুর ভয় "বাংলা হতেই হবে"। কেউ আবার ওই কারণেই সাবাশি দিচ্ছে। কেউ বলছে বাধ্যতা কি আর সাধে? ইঁটের উত্তর তো পাটকেলই হতে হয়। একটা বিষয়ে সবাই একমত। 'বাঙালি'কে বাংলা গিলিয়ে না খাওয়ালে কোনও আশা নেই (নো পান ইন্টেন্ডেড)।

উচ্চ-man

এমনি ফেসবুকে বিশেষ আসা হয় না আজকাল। এলেও চতুর্দিকে যা দেখি, পারতপক্ষে চুপচাপ থাকি। কথা বাড়ালেই বাড়ে, আর বেশি বেড়ে গেলেই ক্লান্ত লাগে। ফেসবুকটা এখন ফোনবুকে এসে ঠেকেছে।
কদিন আগেই ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ ছিল দেখছিলাম, আর লোটা-মাচা করে খিস্তাখিস্তিতে নিউজ়ফিড বোঝাই হয়ে যাচ্ছিল। এই বাঙাল-ঘটির তরজার কিছু একটা ফুর্তির জায়গা আছে নিশ্চয়ই, নইলে লোকের এত পুলক কিসের, বোর হয় না কেউই। কিন্তু ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ম্যাচের মতই ও রসে আমি বঞ্চিত। ফ্যানাটিক হওয়া আমার ধাতে নেই। লোটা-কম্বল-মাচা-মশারি নিয়ে যে কত ক্রিয়েটিভ খিস্তি-মিম-নির্মাণ সম্ভব আর অত বোঝা বয়ে যে কত নিচে নামা সম্ভব, না দেখলে পেত্যয় যায় না। সে যাক, যে যা করে ভাল আছে থাক গিয়ে, ভাবি আমি। দেখি শুধু। কালও দেখছিলুম। এর মধ্যেই দেখি একগাদা পরমব্রত-বয়কট মার্কা স্টেটাস। সঙ্গে ওই লালহলুদসবুজমেরুনমার্কা হ্যাশট্যাগ।

ছুটির দায়

যখন গরমের ছুটি পড়ত,যখন ছুটি-ছুটি হত আর আমার যুক্তিফুল-মাখা ভাত পড়ে থাকত, যখন ছুটি-ছুটি হয়ে গেলেই হাতেরলেখা নিয়ে বসতে হত আর ভাবতাম কেন জড়ানো হাতের লেখা শিখতে হবে যদি সেই নিটনেসের জন্যে ছেড়ে ছেড়েই লিখতে বলবে, আর যখন লিখতে ভাল্লাগছে না বলে মায়ের পাশটাতেই ঘুমের ভান করে শুয়ে পড়তাম, আর জানলা দিয়ে শুধু ফুটফুটে নীল আকাশের গায়ে তিনটে নারকোল গাছের মাথা দেখতাম, আর তারও ওপরে অনেক দূরে কালো কালো দাগের মত ছোট হয়ে যাওয়া চিল উড়ত আর ভাবতাম ওরা ডানা ঝাপটায় না কেন, শুধু গ্লাইড করে কি করে, আর এভাবেই কি জটায়ু উড়ত আর তাই ওর ডানা কেটে দেওয়া অত ইজ়ি ছিল, আর এভাবেই কি গাংচিলও উড়ে মাছ চুরি করতে গিয়ে বগাপুলিশের হাতে ধরা পড়ে যেত আর সেই ভয়ে ভুতু আর হাঁসুখোকা গুটি গুটি সরে পড়ত, এসব ভাবতে ভাবতে বেখেয়াল হয়ে যেতাম, তখনই মায়ের ঘুম ভেঙে যেত আর হাতেরলেখা একটুও এগোয়নি বলে রেগে যেত কারণ প্রত্যেকবারের মতই আমার ছুটির কাজ জমতে থাকত শেষদিনটার জন্যে।

বন্ধুত্ব

লোকজনের সাধারণতঃ একটা প্রবণতা থাকে প্রমাণ দেওয়ার যে "এতগুলো লোক আমায় নিয়ে খুশি (অর্থাৎ আমি বেশ ভালই সঙ্গে নিয়ে চলার মত একটা মানুষ)"। নিজেও অন্যদের একইভাবে নম্বর দেয় ও বিচার করে। সেই ছোটবেলা থেকে এর ট্রেনিং শুরু হয়। যবে থেকে স্কুল-জাতীয় কিছুতে ঢুকিয়ে দেয়, তবে থেকেই আশা করে প্যাস্টেল-চিবানো, কানে-পেন্সিল-গোঁজা, নাক-থেকে-সিকনি-গড়ানো সতীর্থদের মধ্যে থেকে নিজের clique খুঁজে নেবে ছোটরা। আর সে দায়িত্বটা ঠিকমত পালন হচ্ছে কিনা পরীক্ষা করে "কিইইই, বাবুসোনা? ইস্কুলে কটা বন্ধু হল?" বিশেষ করে বাচ্চা-in-question যদি introvert, লাজুক হয়, তবে তো এই পরীক্ষা প্রতি হপ্তার exercise! গেঁড়েটা হয়তো ভাবতেই পারেনা যে তার একাধিক বন্ধু সংগ্রহ করার কথা। তারমধ্যেই পরবর্তী প্রশ্ন থাকে তাদের বন্ধুদের কি নাম। বলতে না পারলেই "এ বাবা! বন্ধুকে নাম জিজ্ঞেস কর নি? বন্ধুর নাম জানতে হয় তো!" সবে হয়তো ইরেজ়ার আদান-প্রদান দিয়ে একটা আধো-পরিচিতি তৈরি হচ্ছিল, খুদেটা সবে নিজের স্বভাবের সাথে নতুন-প্রাণীটা ঠিক কিভাবে কম্প্লিমেন্ট করবে, বা আদৌ করবে কিনা বুঝে ওঠার চেষ্টা করছিল, 'হিতৈষী' গুরুজনের গুঁতোয় বেহিসেবী লেবেল মেরে দিতে শুরু করে দিতে হল তাকে। ব্যাপারটা অফিশিয়াল আর কারখানা-সম করে তোলার জন্যে রইল অমোঘ 'ভাব' (বুড়ো-আঙুল সহযোগে)। পরে যদি সুবিধে না হয়, তার জন্যে তো উপায় আছেই: আড়ি।

পাত্র যখন বরকর্তা

যখন মেয়েগুলোর বিয়ে হয়, মানে কনেপক্ষকে চিনি, তাদের শখ-আহ্লাদগুলো, বিয়েতে কি কি হবে, কোনটা কোনটা যেন কক্ষনও না হয়, সবটাই খুব অব্ভিয়াস মনে হয়। সবটাই যেন কনেকে ঘিরে, কনের মন রেখে, কনের কথা ভেবে। কনেই তো মেন অ্যাট্রাক্শন! তাকে ঘিরেই তো এত হুজুগ। অনুষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র তো সে-ই। বাকি সবকিছু যেন তার জন্য সেজে উঠেছে। তাই সেই বিয়েগুলোতে পাত্রগুলোকেও প্রায় সেই সজ্জার অঙ্গ বলেই মনে হয়। চিনি না বলেই হয়তো। মনে হয় যেন মেয়েগুলোরই বিয়ে, সেটা সফল করতেই ফুল-মালা-পোর্টেবল থামের মত পাত্রও জোগাড় করে আনা হয়েছে। মেয়েটা যাতে লজ্জাবতী পোজ় দিতে পারে, তাই প্রপ হিসেবে বরের আমদানি।

বাংলা দিবস

যখন ছোট ছিলাম, পয়লা বৈশাখে নতুন জামা পরার চল ছিল। তখন দুবার নতুন জামা হত। পুজো আর পয়লা বৈশাখ। আর দাদু নতুন নন্টে-ফন্টে কিনে দিত। বা অন্য কোনও বই। তবে মেনলি নন্টে-ফন্টে। সবার ছুটির দিন বলে ভাল খাওয়া-টাওয়াও হয়েছে। হালখাতার খাওয়া খাইনি যদিও কখনও। কিন্তু মারাত্মক কোনও মাতামাতি হত না। টিভিতেও বাড়াবাড়ি রকমের ঘটাপটা হত না। সবাই যদিও তখন সরদিন ইংরিজি বলার প্রাণপণ চেষ্টা করত না, যে তার কনট্রাস্টে আজকের দিনটায় বাংলা বলবে। আর হ্যাঁ, দাদু-ঠাকুমারা বাংলা সাল বলতে পারত কেউ কেউ কিন্তু আমরা বাকিরা এই একটা দিনের জন্যে সেটা বলতে পারার কুইজটাতে অবশ্যই মজতাম না। যে সালটা ধরে রোজ কাজ চলে, সেটা নিয়ে গর্বও ছিল না, লজ্জাও না। আর যেটার দরকার পড়ছে না, এই একটা দিনের জন্যে সেটা রিসার্চ করে (ইং-বং ক্যালেন্ডার দেখে, গুগল করে না) খেলা দেখানোর কোনও চল ছিল না।

প্রথম টিউশন কাটা

আমি তখন সবে মাধ্যমিক দিয়েছি। টিপিকাল বাঙালির মত আমারও ওই তিন মাস বিবিধ টিউশনে দৌরাত্ম্যি করেই কাটছে। আমার বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা ভয়ানক সীমিত। তার ওপর তারা কেউ আশেপাশে থাকেও না। মেয়েদের স্কুলে পড়তাম বলে তারাও সবাই মেয়ে। তার মধ্যে আমি একটু বেশি ঘরকুনো। সব মিলিয়ে ঘরে-বাইরে ইমেজটা এক্কেবারে নিরীহ গোবেচারা। এমনিতে বাবা-মা-ভাইয়ের ওপর দিব্যি দাপট চলে ঠিকই, কিন্তু সেসব সামান্য টিভি, কম্পিউটার, গল্পের বই কেন্দ্র করেই। আর মাঝেমধ্যে ওই ছুটির তিনমাস পড়াশোনা ত্যাগ করার মৌলিক অধিকারের দাবিতে। এর বেশি কিছু নিয়ে কথা বলার আমার দরকারই পড়ে না। এই নিরীহতার সুবিধে হল বাড়ির যে টিউশন ছাড়া একা বেরনোর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং পড়তেই যে যাই সেটা যাচাই করতে যে ওরা আনতে যাবার নিয়ম রেখেছিল, সেটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। তাই অবলুপ্ত না হলেও শিথিল নিয়মরক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

শ বাবু #৬

ওই কথা শোনার পর মা যথেচ্ছ শাসন করল, বাবা প্রথমে নাক গলাল না (সম্ভবতঃ ওই শাসনটা ডিজার্ভ করি ভেবেছিল)। তারপর বাবা জানতে বসল ঠিক কী হয়েছিল। বললাম। ইতিমধ্যে বাবার সাথে লোকটার কথা হয়ে গেছে এবং আবার আসবে। আমি যেন পারতপক্ষে ভব্যতা বজায় রাখি সে বিষয়ে কিছু বলল-টলল, আমি বিশেষ কান দিইনি। কিন্তু কথা হল, সময় ভাগ করা হবে সব সাবজেক্ট-এর জন্যে, এবং মুখস্থ করা নিয়ে বেশি চাপ নিতে হবে না। কিন্তু লোকটা এখনও দূর হল না।
পরেরবার যখন এল, ততক্ষণে আমি আমার চোয়াল শক্ত করে রেডি, কথা না বলে যথাসম্ভব প্রকাশ করার চেষ্টা করছি যে আমি একটুও অনুতপ্ত নই। অ্যাডিশনাল করা হবে স্থির হল। খানিকটা হিজিবিজি করেই আবার কম্পাল্সারি ম্যাথ, না হলে ফিজিকাল সাইন্স। বেশ, এটা রিপোর্ট করতে হবে। আরও দিন খানেক এরকম গেল। প্যাটার্ন পেয়ে গেলাম। অ্যাডিশনাল করতে হলেই খুব আপত্তি থাকে লোকটার। এই সুযোগ তো ছাড়া যাবে না। অতি অবশ্যই ঘন ঘন আমার অ্যাডিশনাল পরীক্ষা থাকতে লাগল। ১০০-র বেশি-ই হবে। অ্যাডিশনাল করতে হলেই লোকটা এক্সট্রা ঝিমিয়ে থাকে। খুবই ভাল ব্যাপার। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেলাম যে আবার একদিন হঠাত্‍ এল না।

শ বাবু #৫

দিন যায়। তিনদিন টাইম হবে না বলে ২ ঘন্টার বদলে ৩ ঘন্টা লোকটার ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে হয়। "কঠোর বিদ্যাভ্যাস" আয়ত্তের অজস্র "টোটকা" শুনি। কেমন লোকটার সাক্সেসফুল কেরিয়ারের পেছনে পাখাবিহীন চিলেকোঠায় বাইরে থেকে শেকল তুলে বন্দী থাকার অবদান সবচেয়ে বেশি। কেমন রামকৃষ্ণ মিশনের ঠেঙানির অবদান তার পরেই। ইতিমধ্যে আমার হাতের লেখা পাল্টে ওর মত করে ফেলতে হয়েছে (যেটা কিনা হুবহু এরিয়াল ফন্ট, নো কার্সিভ্ অ্যালাওড)। পরীক্ষা যে শেষ হয় না, বলাই বাহুল্য।

শ বাবু #৪

আমার বাড়িতে এমনিতেই টিউটরকে খাওয়ানোর চল আছে। তার ওপর নাকি সেএএএএএই রাজাবাজার থেকে সোজা আমাদের বাড়ি আসে। নিত্য মা টোস্ট-অমলেট-চা কিম্বা লুচি-তরকারি খাওয়াতে লাগল আর প্রবল আহা-উহু করতে থাকল। লোকটাই হিরো। আমি একটা বাজে অব্স্ট্যাকল। ইতিমধ্যে আমি নাইনে উঠে গেলাম আর আমার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও একে অ্যাডিশনাল পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হল।
ইতিমধ্যে ভাইয়ের কপাল খুলে গেল। শ-বাবুও বলল ওকে আর পড়াবে না (ও নাকি খুবই ছোট) আর ওর বন্ধুদের দেখাদেখি ওকে ওর স্কুলেরই এক খোঁয়াড়ে পুরে দেওয়া হল এবং প্রথমে অনেক আপত্তির পর ও অচিরেই বাড়ির বাইরে, গ্রুপে পড়ার ফুর্তি বুঝে ফেলল।

শ বাবু #৩

এই বয়সে এসে অনেকগুলো টিউশন করিয়ে ফেলে নিজেকে আবার লোকটার জায়গায় কল্পনা করলাম। প্রতিবারের মত এবারও কুঁকড়ে গেলাম। আমার কারণে আমারই স্টুডেন্ট আমারই সামনে বসে কেঁদে দিলে আমি সম্ভবতঃ তক্ষুনি পালাব। আর কোনওদিন যে সে বাড়িতে পা রাখব না বলাই বাহুল্য। কিন্তু সবাই তো আমি নয়, এ তো নয়ই। দিব্যি বসে আমার কান্নার ওপর দিয়েই নোট দিয়ে যেতে লাগল, আর অবাক কান্ড, আমিও মিস করার ভয়ে লিখতেও লাগলাম! অতি অবশ্যই লেখানো হল নিউটনের ফার্স্ট ল।

“Everyobjectcontinuestobeinastateofrestorofuniformmotioninastraightlineunlesscompelledbysomeexternalforcetoactotherwise”! 

শ বাবু #২

ভাই বেরিয়ে গেল। আমার সন্দেহ হল এই ট্রমা কাটিয়ে উঠে ওর পক্ষে আর কোনওদিন হিন্দী গান গাওয়া সম্ভব হবে না। আরেকদিকে মনের ভেতর সুনামিক প্রশ্ন যে হিন্দী গান গাইলে কী হয়। কিনতু এ যা জিনিস! একে জিজ্ঞেস করলে নির্ঘাত ব্রহ্মতেজে ঝলসে দেবে। আমি চুপচাপ ‘নোট’ নিতে লাগলাম আর আড়চোখে দেখতে লাগলাম। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ইচ্ছে হল।
যখন প্রথমবার শুনেছিলাম এবার দিদিমণির পরিবর্তে স্যার, দেদার পুলক হয়েছিল। কে না জানে টিউশন স্যারেরা ভবিষ্যৎ প্রেমিক হয়। বাবার সাথে যেদিন কথা বলে গেল, উঁকি ঝুঁকি মেরেও বেশি কিছু দেখতে পেলুম না। কৌতুহলের মত জিনিস নিবৃত্ত না হলে যা হয়। উত্তেজনা আর কল্পনা পাল্লা দিতে লাগল। প্রথমে ভাইকে পড়াবে শুনে খুব খুশি হলুম। অবজ়ার্ভেশনের পক্ষে খুবই অনুকূল সংবাদ। লোকটা এল একটা তালপাতার সেপাই। ফটফটে ফরসা। একটু সন্দেহ হল রোগা হতে হতে সী-থ্রু হয়ে গেছে কিনা। তা হোক, মনকে বোঝালাম। দেখতে নিয়ে ভাবে শ্যালোরা। কিন্তু গোটা সেশনটায় পাশের ঘর থেকে যা চাপা গর্জন আসতে লাগল পুরো বাড়া-ভাতে ছাই।

শ বাবু #১

টিউশন বস্তুটা আমার সাথে লেপ্টে গেল আমার ক্লাস সিক্স থেকে। আমার বেশির ভাগ সহযোদ্ধাদের থেকে কিছুটা দেরিতেই। কিন্তু আমার বাবা কিঞ্চিৎ সেকেলে বলে টিউশন এড়াচ্ছিল। বোধহয় নিজের একখানি তিক্ত অভিজ্ঞতাও একটা কারণ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দিতে পা গলিয়ে মাধ্যমিকের গুরুত্বকে অস্বীকার করে, বোর্ড-সিলেবাসীয় প্যানিক উপেক্ষা করে সন্তান মানুষ করবে, এই ধক মানুষের ছিল না। আমার বাবারও না। মায়ের তো না-ই। অতএব অনেক খোঁজ-খবর-ঝাড়াই-বাছাইয়ের পর ধ-দিদিমণি নিয়োজিত হলেন। বেশ ভাল ছিল, অল্প বকত , কিন্তু আমার বাড়ির টীচারদের মধ্যে ওই বেস্ট! তার বছর দুই পর আবার একটা টিউটোরিয়াল। সেখানে দেদার বন্ধু ছিল, নিজের স্কুলের, অন্য স্কুলের … তারপরেই বাড়িতে একজন স্যার। এই প্রাণীটিকে নিয়ে কথা খরচ করা যেতেই পারে, কারণ আমার অতগুলো অভিজ্ঞতাকে একফুয়ে উড়িয়ে দিতে পারে ওই লোক।
যদি ভাল্লাগে...email-এ sign up করতে পারেন/পারো/পারিস, নতুন লেখা ছাড়া কিচ্ছু পাঠাবো না, promise...