যখন গরমের ছুটি পড়ত,যখন ছুটি-ছুটি হত আর আমার যুক্তিফুল-মাখা ভাত পড়ে থাকত, যখন ছুটি-ছুটি হয়ে গেলেই হাতেরলেখা নিয়ে বসতে হত আর ভাবতাম কেন জড়ানো হাতের লেখা শিখতে হবে যদি সেই নিটনেসের জন্যে ছেড়ে ছেড়েই লিখতে বলবে, আর যখন লিখতে ভাল্লাগছে না বলে মায়ের পাশটাতেই ঘুমের ভান করে শুয়ে পড়তাম, আর জানলা দিয়ে শুধু ফুটফুটে নীল আকাশের গায়ে তিনটে নারকোল গাছের মাথা দেখতাম, আর তারও ওপরে অনেক দূরে কালো কালো দাগের মত ছোট হয়ে যাওয়া চিল উড়ত আর ভাবতাম ওরা ডানা ঝাপটায় না কেন, শুধু গ্লাইড করে কি করে, আর এভাবেই কি জটায়ু উড়ত আর তাই ওর ডানা কেটে দেওয়া অত ইজ়ি ছিল, আর এভাবেই কি গাংচিলও উড়ে মাছ চুরি করতে গিয়ে বগাপুলিশের হাতে ধরা পড়ে যেত আর সেই ভয়ে ভুতু আর হাঁসুখোকা গুটি গুটি সরে পড়ত, এসব ভাবতে ভাবতে বেখেয়াল হয়ে যেতাম, তখনই মায়ের ঘুম ভেঙে যেত আর হাতেরলেখা একটুও এগোয়নি বলে রেগে যেত কারণ প্রত্যেকবারের মতই আমার ছুটির কাজ জমতে থাকত শেষদিনটার জন্যে।
বন্ধুত্ব
লোকজনের সাধারণতঃ একটা প্রবণতা থাকে প্রমাণ দেওয়ার যে "এতগুলো লোক আমায়
নিয়ে খুশি (অর্থাৎ আমি বেশ ভালই সঙ্গে নিয়ে চলার মত একটা মানুষ)"। নিজেও
অন্যদের একইভাবে নম্বর দেয় ও বিচার করে। সেই ছোটবেলা থেকে এর ট্রেনিং শুরু
হয়। যবে থেকে স্কুল-জাতীয় কিছুতে ঢুকিয়ে দেয়, তবে থেকেই আশা করে
প্যাস্টেল-চিবানো, কানে-পেন্সিল-গোঁজা, নাক-থেকে-সিকনি-গড়ানো সতীর্থদের
মধ্যে থেকে নিজের clique খুঁজে নেবে ছোটরা। আর সে দায়িত্বটা ঠিকমত পালন
হচ্ছে কিনা পরীক্ষা করে "কিইইই, বাবুসোনা? ইস্কুলে কটা বন্ধু হল?" বিশেষ
করে বাচ্চা-in-question যদি introvert, লাজুক হয়, তবে তো এই পরীক্ষা প্রতি
হপ্তার exercise! গেঁড়েটা হয়তো ভাবতেই পারেনা যে তার একাধিক বন্ধু সংগ্রহ করার
কথা। তারমধ্যেই পরবর্তী প্রশ্ন থাকে তাদের বন্ধুদের কি নাম। বলতে না পারলেই "এ
বাবা! বন্ধুকে নাম জিজ্ঞেস কর নি? বন্ধুর নাম জানতে হয় তো!" সবে হয়তো
ইরেজ়ার আদান-প্রদান দিয়ে একটা আধো-পরিচিতি তৈরি হচ্ছিল, খুদেটা সবে নিজের
স্বভাবের সাথে নতুন-প্রাণীটা ঠিক কিভাবে কম্প্লিমেন্ট করবে, বা আদৌ করবে
কিনা বুঝে ওঠার চেষ্টা করছিল, 'হিতৈষী' গুরুজনের গুঁতোয় বেহিসেবী লেবেল
মেরে দিতে শুরু করে দিতে হল তাকে। ব্যাপারটা অফিশিয়াল আর কারখানা-সম করে
তোলার জন্যে রইল অমোঘ 'ভাব' (বুড়ো-আঙুল সহযোগে)। পরে যদি সুবিধে না হয়, তার
জন্যে তো উপায় আছেই: আড়ি।
পাত্র যখন বরকর্তা
যখন মেয়েগুলোর বিয়ে হয়, মানে কনেপক্ষকে চিনি, তাদের শখ-আহ্লাদগুলো, বিয়েতে কি কি হবে, কোনটা কোনটা যেন কক্ষনও না হয়, সবটাই খুব অব্ভিয়াস মনে হয়। সবটাই যেন কনেকে ঘিরে, কনের মন রেখে, কনের কথা ভেবে। কনেই তো মেন অ্যাট্রাক্শন! তাকে ঘিরেই তো এত হুজুগ। অনুষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র তো সে-ই। বাকি সবকিছু যেন তার জন্য সেজে উঠেছে। তাই সেই বিয়েগুলোতে পাত্রগুলোকেও প্রায় সেই সজ্জার অঙ্গ বলেই মনে হয়। চিনি না বলেই হয়তো। মনে হয় যেন মেয়েগুলোরই বিয়ে, সেটা সফল করতেই ফুল-মালা-পোর্টেবল থামের মত পাত্রও জোগাড় করে আনা হয়েছে। মেয়েটা যাতে লজ্জাবতী পোজ় দিতে পারে, তাই প্রপ হিসেবে বরের আমদানি।
বাংলা দিবস
যখন ছোট ছিলাম, পয়লা বৈশাখে নতুন জামা পরার চল ছিল। তখন দুবার নতুন জামা হত। পুজো আর পয়লা বৈশাখ। আর দাদু নতুন নন্টে-ফন্টে কিনে দিত। বা অন্য কোনও
বই। তবে মেনলি নন্টে-ফন্টে। সবার ছুটির দিন বলে ভাল খাওয়া-টাওয়াও হয়েছে। হালখাতার খাওয়া খাইনি যদিও কখনও। কিন্তু মারাত্মক কোনও মাতামাতি
হত না। টিভিতেও বাড়াবাড়ি রকমের ঘটাপটা হত না। সবাই যদিও তখন সরদিন ইংরিজি
বলার প্রাণপণ চেষ্টা করত না, যে তার কনট্রাস্টে আজকের দিনটায় বাংলা বলবে। আর হ্যাঁ, দাদু-ঠাকুমারা
বাংলা সাল বলতে পারত কেউ কেউ কিন্তু আমরা বাকিরা এই একটা দিনের জন্যে সেটা বলতে পারার
কুইজটাতে অবশ্যই মজতাম না। যে সালটা ধরে রোজ কাজ চলে, সেটা নিয়ে গর্বও
ছিল না, লজ্জাও না। আর যেটার দরকার পড়ছে না, এই একটা দিনের জন্যে সেটা রিসার্চ করে (ইং-বং ক্যালেন্ডার
দেখে, গুগল করে না) খেলা
দেখানোর কোনও চল ছিল না।
প্রথম টিউশন কাটা
আমি তখন সবে মাধ্যমিক দিয়েছি। টিপিকাল বাঙালির মত আমারও ওই তিন মাস বিবিধ টিউশনে দৌরাত্ম্যি করেই কাটছে। আমার বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা ভয়ানক সীমিত। তার ওপর তারা কেউ আশেপাশে থাকেও না। মেয়েদের স্কুলে পড়তাম বলে তারাও সবাই মেয়ে। তার মধ্যে আমি একটু বেশি ঘরকুনো। সব মিলিয়ে ঘরে-বাইরে ইমেজটা এক্কেবারে নিরীহ গোবেচারা। এমনিতে বাবা-মা-ভাইয়ের ওপর দিব্যি দাপট চলে ঠিকই, কিন্তু সেসব সামান্য টিভি, কম্পিউটার, গল্পের বই কেন্দ্র করেই। আর মাঝেমধ্যে ওই ছুটির তিনমাস পড়াশোনা ত্যাগ করার মৌলিক অধিকারের দাবিতে। এর বেশি কিছু নিয়ে কথা বলার আমার দরকারই পড়ে না। এই নিরীহতার সুবিধে হল বাড়ির যে টিউশন ছাড়া একা বেরনোর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং পড়তেই যে যাই সেটা যাচাই করতে যে ওরা আনতে যাবার নিয়ম রেখেছিল, সেটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। তাই অবলুপ্ত না হলেও শিথিল নিয়মরক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শ বাবু #৬
ওই কথা শোনার পর মা যথেচ্ছ শাসন করল, বাবা প্রথমে নাক গলাল না (সম্ভবতঃ ওই শাসনটা ডিজার্ভ করি ভেবেছিল)। তারপর বাবা জানতে বসল ঠিক কী হয়েছিল। বললাম। ইতিমধ্যে বাবার সাথে লোকটার কথা হয়ে গেছে এবং আবার আসবে। আমি যেন পারতপক্ষে ভব্যতা বজায় রাখি সে বিষয়ে কিছু বলল-টলল, আমি বিশেষ কান দিইনি। কিন্তু কথা হল, সময় ভাগ করা হবে সব সাবজেক্ট-এর জন্যে, এবং মুখস্থ করা নিয়ে বেশি চাপ নিতে হবে না। কিন্তু লোকটা এখনও দূর হল না।
পরেরবার যখন এল, ততক্ষণে আমি আমার চোয়াল শক্ত করে রেডি, কথা না বলে যথাসম্ভব প্রকাশ করার চেষ্টা করছি যে আমি একটুও অনুতপ্ত নই। অ্যাডিশনাল করা হবে স্থির হল। খানিকটা হিজিবিজি করেই আবার কম্পাল্সারি ম্যাথ, না হলে ফিজিকাল সাইন্স। বেশ, এটা রিপোর্ট করতে হবে। আরও দিন খানেক এরকম গেল। প্যাটার্ন পেয়ে গেলাম। অ্যাডিশনাল করতে হলেই খুব আপত্তি থাকে লোকটার। এই সুযোগ তো ছাড়া যাবে না। অতি অবশ্যই ঘন ঘন আমার অ্যাডিশনাল পরীক্ষা থাকতে লাগল। ১০০-র বেশি-ই হবে। অ্যাডিশনাল করতে হলেই লোকটা এক্সট্রা ঝিমিয়ে থাকে। খুবই ভাল ব্যাপার। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেলাম যে আবার একদিন হঠাত্ এল না।
শ বাবু #৫
দিন যায়। তিনদিন টাইম হবে না বলে ২ ঘন্টার বদলে ৩ ঘন্টা লোকটার ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে হয়। "কঠোর বিদ্যাভ্যাস" আয়ত্তের অজস্র "টোটকা" শুনি। কেমন লোকটার সাক্সেসফুল কেরিয়ারের পেছনে পাখাবিহীন চিলেকোঠায় বাইরে থেকে শেকল তুলে বন্দী থাকার অবদান সবচেয়ে বেশি। কেমন রামকৃষ্ণ মিশনের ঠেঙানির অবদান তার পরেই। ইতিমধ্যে আমার হাতের লেখা পাল্টে ওর মত করে ফেলতে হয়েছে (যেটা কিনা হুবহু এরিয়াল ফন্ট, নো কার্সিভ্ অ্যালাওড)। পরীক্ষা যে শেষ হয় না, বলাই বাহুল্য।
Subscribe to:
Posts (Atom)
যদি ভাল্লাগে...email-এ sign up করতে পারেন/পারো/পারিস, নতুন লেখা ছাড়া কিচ্ছু পাঠাবো না, promise...